রণক্ষেত্র নয়, মুসলিমরা হেরেছে যেখানে!



 কয়েক শতাব্দী আগের কথা। কনস্টান্টিনোপল পেরিয়ে ট্রাবেজানের (পন্টোস) দেওয়ালে যখন উসমানীয়দের বিজয় পতাকা পতপত করে উড়ছিল, তখন ইউরোপের আকাশ জুড়ে ছিল কেবলই আতঙ্কের ছায়া। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই মহাপরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের সূর্য একসময় অস্তমিত হলো।


​ইতিহাস সাক্ষী, কেবল সম্মুখ সমরে মুসলিমদের অপরাজেয় ঈমানী শক্তিকে পরাস্ত করা অসম্ভব অনুধাবন করে, কুফুরী শক্তি এক ভিন্ন ও সূক্ষ্ম যুদ্ধকৌশল বেছে নিয়েছিল— যার লক্ষ্য ছিল মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক পরিবর্তন।

​বিলাসিতা, আদর্শিক শিথিলতা এবং পশ্চিমা ভাবধারার অনুপ্রবেশের মধ্য দিয়ে মুসলিম যুবসমাজের একাংশের চিন্তজগতে পরিবর্তন আনা হয়। এই দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় বিশ শতকের শুরুতে মুস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্বে খেলাফত ব্যবস্থার অবসান এবং ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক তুরস্কের উত্থানের মধ্য দিয়ে।

​পরবর্তীতে সরাসরি ইসলামের বিরোধিতা না করে, "ইসলামের আধুনিকায়ন"-এর নামে এমন কিছু ধারণার জন্ম দেওয়া হয়, যা মূলধারার ইসলামী বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। সেখান থেকে ৫টি দিক হলো:

​১. আপেক্ষিক মানবতাবাদ ও ধর্মীয় সমতা

​"ইসলাম মানবতা শেখায়"— এই শাশ্বত সত্যকে ঢাল বানিয়ে সকল মতবাদ ও ধর্মকে আধ্যাত্মিক দিক থেকে সমান প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। অথচ ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, আল্লাহর মনোনীত একমাত্র চূড়ান্ত জীবনবিধান হলো ইসলাম।

​২. ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ

​উম্মাহর বিশ্বজনীন ও সীমানাহীন ঐক্যের ধারণাকে সংকুচিত করে, আধুনিক রাষ্ট্রসীমা ও জাতীয়তাবাদকে ধর্মীয় বন্ধনের ওপর স্থান দেওয়া হয়, যা মুসলিম বিশ্বকে খণ্ডিত করেছে।

​৩. সার্বভৌমত্ব বনাম গণতন্ত্র

​গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার "জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস" এই স্লোগানকে ইসলামের শুরা (পরামর্শ) ব্যবস্থার সমার্থক দাবি করার চেষ্টা করা হয়। অথচ ইসলামের মূল ভিত্তি হলো— চাক্ষুষ ও চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব একমাত্র মহান আল্লাহর।

​৪. আদর্শিক সীমারেখা ও মৈত্রী

​মানবিক সৌজন্য আর দ্বীনী আনুগত্যের পার্থক্য মুছে দিয়ে অমুসলিম শক্তির সাথে এমন কৌশলগত ও আদর্শিক মৈত্রী স্থাপন করা হয়, যা কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশনার (মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফেরদের অন্তরঙ্গ বন্ধু না বানানো) পরিপন্থী।

​৫. জিহাদের অপব্যাখ্যা

​আত্মরক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য "জিহাদ"-এর মূল ধারণাকে আধুনিক পরিভাষায় কেবল "সন্ত্রাসবাদ" হিসেবে চিত্রায়িত করার মানসিকতা তৈরি করা হয়, যা মুসলিমদের প্রতিরোধ স্পৃহাকে দুর্বল করে দেয়। পরিবর্তে গনতান্ত্রিক ভোটকে আধুনিক জিহাদ মনে করা


​সারসংক্ষেপ: সমরাস্ত্রের যুদ্ধের চেয়েও বিপজ্জনক হলো চিন্তার যুদ্ধ (intellectual warfare)। খিলাফতের পতনের পর আধুনিকায়নের মোড়কে যে ফিতনার সূত্রপাত হয়েছিল, তা থেকে নিজেদের ঈমান ও ঐতিহ্য রক্ষা করতে বিশুদ্ধ ইসলামী জ্ঞান এবং সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।


-বান্দা আল কাউসার

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন